কাছ থেকে দেখা

পর্ব ৫৪

সকাল থেকেই সেদিন ভীষণ অস্থি আমিভয় লাগছে ভীষণ। রাগও হচ্ছে প্রচণ্ড মিসেস ওতার উপরভাবছি সাফায়াতের কি এমন সমস্যা ওর চোখে ধরা পড়েছে যে সে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেআবার যখনই মনে হচ্ছে সে তো একজন  ডে কেয়ারের টিচার শত শত বাচ্চা দেখে অভ্যস্ত নিশ্চয় কিছু টের পেয়েছে তখনই ভয়ে আবার আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছেএদিকে ছেলে আমার নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে

দুপুর গড়িয়ে গেলোমিসেস ওতা এলো আমাদের নিয়ে যেতেগাড়ীতে মহিলা বিভিন্ন ধরনের গল্প করে আমাকে কিছুটা টেনশ ফ্রী করলোতবুও ভীরু ভীরু পায়ে আমি ছেলেকে নিয়ে ডাক্তারের রুমে গিয়ে বসলামশুরু হোল ডাক্তারের প্রশ্নের পর প্রশ্ন।

আমি কথা বলছি ডাক্তারের সাথে অন্যদিকে সাফায়াত চাকাওয়ালা চেয়ারটাকে শুধু ঘুরিয়ে যাচ্ছিলোলাইটের সুইচ জালাচ্ছে নেভাচ্ছেডাক্তার কতগুলো খেলনা দিলো খেলতে কিন্তু সাফায়াতের খেলনার প্রতি তেমন কোন আগ্রহ নেই

ডাক্তার কিছুক্ষণ চিন্তা করে ঠাৎ বললো সম্ভবত তোমার ছেলে অটিজমে ভুগছেশোনার পর কেন যেন আমার মুখ দিয়ে একটা কথাও বের হোলনা আমি সাফায়াতের দিকে শুধু তাকিয়েই রইলাম

অটি শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম আমি যখন সাইকোলজিতে অনার্স পড়ি তখনখুব একটা মনে নেইতবে এটা একটা দারুন কষ্টে অসুখ যা সাধারমানুষদের কিছুতেই বোঝানো যায়না অসুখ থেকে সম্পুর্ণ কিউর হওয়া কখনোই সম্ভব না তবে ট্রেনিংএ কিছুটা উন্নতি হতে পারে

সাফায়াতকে জাপটে কোলে চেপে ধরলামসেও আলতোভাবে ওর মাথাটা আমার বুকে এলিয়ে দিলোমনে মনে বললাম আমাকে ভেঙ্গে ড়লে চলবে নাবুকের ষ্টটাকে প্রশ্র না দিয়ে ডাক্তারকে বললাম এখন আমি কি করবো?

ডাক্তারের পরামশ অনুযায়ী সাফায়াতকে বেবি কেয়ারে র্তি করাবার জন্য উঠে পড়ে লাগলামএখানে সব জায়গায় এপ্রিল থেকে সেশন শুরু হয় তখন ছিলো অক্টোবর মাস কেউ নিতে চায়না তবুও আল্লহর কি রহমত মিহো যেই বেবিকেয়ারে যেতো সেখানকার প্রিন্সিপালই সব শুনে স্পেশাল কন্সিডার করে সাফায়াতকে র্তি করিয়ে নিলো

বিশ জন বাচ্চা ছিলো ওর ক্লাসে সবাই ওরই বয়সীবাচ্চাদের কাছ থেকে হয়তো কিছু শিখবে টিচাররাও হয়তো কিছু শেখাবে সেই আশাতেই বেবি কেয়ারে দেওয়াকিন্তু সে সেখানেও একা একাই থাকতে চায় ক্লাসরুম থেকে খোলা জায়গাই তার বেশি পছন্দটীচাররাও ঠিকমত হ্যাণ্ডেল করতে পারছে নাচিন্তায় সারারাত বাবা-মা দুজনই আমরা ঘুমুতে পারিনা

মিহো তখন মাত্র ক্লাস ওয়ানে পড়েত্রিশ মিনিট হেঁটে স্কুলে যেতে হয়। খুব খুশি সেপাড়ার বড় ক্লাসের ছেলেমেয়েরা খুব আদর  করেসকাল সাতটায় মাথায় হেলমেট পড়ে পিঠে বিরাট এক স্কুল ব্যাগ লাগিয়ে মেয়েটা বের হয়। লাল একটা ব্যাগ। এতবার পিছন থেকে দেখলে মনে হয় ব্যাগটাই হেঁটে যাচ্ছেআমি দোতালার জানালা দিয়ে তাকিয়ে থেকেছি কত! একদিন মিহোর ছুটির সময় পেরিয়ে গেছে কিন্তু তবুও সে আসেনা কি করবো বুঝে ঠতে পারছিনাআমি জানালা ধরে অন্যদিনের মত দাড়িয়েই আছি ঠাৎ দেখি মিহোকে দেখা যাচ্ছে কিন্তু মিহোর ক্লাসেরই এক ছেলে ছাতা দিয়ে মিহোর হেলমেটের উপর ঠাস ঠাস বাড়ি দিচ্ছে কি? এসব কি হচ্ছে? কেন এমন করছে? পরে মিহোর কাছে শুনলাম এই ছেলেটা সবসময়ই মিহোকে বিদেশি বলে ক্লাসে জালাতন করেমেয়ে আমার এতদিন কিছুই বলেনিআরেক চিন্তা আমাকে পেয়ে বসলো

(চলবে)

রিনা আমির।


 

স্বপ্নের কুয়েত

৯.

রাতে ঘুমটা যে ভালো হয়েছিল তা সকালে ঘুম থেকেঠার পরে বুঝতে পারলামবেশ ফ্রেশ লাগছিলতাই নাস্তা করে শুরু হয়ে গেলাম ঘর গোছাতেব্যাগ থেকে কাপড় বের করে গুছিয়ে রাখতে আমাকে খুব একটা বেগ পেতে হলো নাকারসেলিম ঘরের কিছু কিছু জিনিস খারাপ কিনলেও দুই রুমে বিশাল বিশাল দুটো আলমারি ভালোই কিনেছেদুপুরে রান্না করতে গিয়ে দেখলাম প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই নেইমসলাগুলো রাখার জন্য কোন জার নেই, সব প্যাকেটের মধ্যেই রয়েছেফ্রিজে কোন খাবার রাখতে গেলে হাড়ি-পাতিল সহই ঢোকাতে হচ্ছে, কোন বক্স নেইঅনেক কিছুই কিনতে হবেবুঝলাম আবার নতুন করে সংসার গোছাতে হবে - আট  বছর আগে যেমন করে গুছিয়েছিলাম

সেলিমের অফিস দুটো পর্যন্তআড়াইটার মধ্যেই বাসায় চলে আসে  লাঞ্চের পর একটু ঘুমিয়ে নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বাইরে যেতামঘরের টুকটাক দরকারি জিনিসও কেনা হতো, আবার ঘোরাও হতোকুয়েতে বেড়ানোর তেমন কোন জায়গা নেইতাই মার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে আমি মার্কেটগুলোর প্রেমে পড়ে গেলামখেয়াল করলাম আর  ওগুলোকে গোডাউন মনে হচ্ছেনাচার-পাঁচ দিন যেতে না যেতেই এক বাঙ্গালীর বাসায় দাওয়াত পেলামরেবেকা আপা এবং ফারুক ভাইওনারা যে এলাকায় থাকেন সে এলাকার নাম ফিন্তাসশুনলেই আমার ফান্টুশ ছবিটার কথা মনে পড়ে যায়ওনারা দুজনেই বাংলাদশ কৃষি ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করছেন তবে সেলিমের অনেক সিনিয়র। ওনাদের বাসায় ঢুকতেই সৌখিনতা আর  রুচিশীলতার ছাপ দেখতে পেলামলম্বা একটা লিভিং রুমখুব সুন্দর আর  পরিপাটি করে সাজানোরুমের একটা কর্নারে শুধু গাছএছাড়া সব ঘরে জানালার বাইরের দিকটা হরেক রকমের গাছ দিয়ে সাজানো। দেখলে আন্দাজ হয় উনি বৃক্ষ প্রেমি মানুষরুমগুলোও অনেক বড় আর  খোলামেলাআমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো নিজের বাসার কথা ভেবে।

আপা রান্না করছিলেনআমি কিচেনে ঢুকে বললাম আপা দেন আমি আপনাকে কিছু হেল্প করিআপা শুনে চিৎকার করে উঠলেন,  এই ফারুক শোন শাহানা কি বলছে, সে আমাকে রান্নার কাজে সাহায্য করতে চায়ফারুক ভাই বললেন শাহানা আজকের পার্টিটা তোমাকে উপলক্ষ্য করেই, তাই তোমাকে কিছুই করতে হবে নাএখানে চুপ করে বস তোমার সাথে গল্প করিরেবেকা আপা বললেন এমনিতেই আমার ছেলের এক্সাম থাকাতে আমরা তোমাকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে যেতে পারিনি তারপর তুমি যদি আমার বাসায় এসে কাজ কর তাহলে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হবেওনাদের এসব কথা শুনে নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ মনে হচ্ছিলআবার কিছুটা লজ্জাও পেলাম বটেসেদিন ওই বাসাতে এরশাদ ভাই, ওয়াহিদ ভাই আর  কামরুল ভাইয়ের সাথে পরিচিত হলামওনাদের সবারই ফ্যামিলি বাংলাদেশে থাকেমহানন্দে তারা ব্যাচেলর জীবন উপভোগ করছেনকিছুক্ষপর আরো একটা ফ্যামিলি এলো। মিস্টার এবং মিসেস ওয়াজেদ। ওনাদের চারটা ছেলেমেয়েগল্প করতে করতে মনে হলো মিসেস ওয়াজেদ অর্থাৎ রুপা আপা আমাকে বেশ পছন্দ করে ফেলেছেআলাপের এক পর্যায়ে তার বাসাতেও পরের সপ্তাহে দাওয়াত পেয়ে গেলামএভাবে কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাচেলর ভাইদের বাসাতেও দাওয়াত খাওয়ার পর্ব শেষ করা হয়ে গেলএবার বিশাল এক গুরুদায়িত্ব এসে পড়লো আমার ঘাড়েশুধু খেলেইতো চলবেনা, খাওয়াতেও হবেমহা একটা লজ্জায় পড়ে গেলামকারসবার বাসাই মোটামুটি ভালো শুধু আমারটাই পচাকিন্তু কিছুই করার নেই; অগত্যা সবাইকে দাওয়াত করলাম

(চলবে)

শাহানাজ পারভিন, কুয়েত।